ডিজিটাল বিশ্বে সুরক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
ডিজিটাল বিশ্ব নিরাপদ রাখতে কার্যকর ভূমিকা নিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন আয়োজিত সাইবার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তথ্য নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়নে জাতিসংঘের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথাও বলেন তিনি।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মঙ্গলবার দুপুরে এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলোকে সাইবার অপরাধের হাত থেকে বাঁচাতে জাতিসংঘকে এগিয়ে আসতে বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ডিজিটাল বিশ্বকে অধিকতর নিরাপদ করে তুলতে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া তথ্য নিরাপত্তা বিধানে নীতিমালা প্রণয়নের কার্যক্রম অব্যাহত থাকা চাই।”
শেখ হাসিনা তথ্য প্রযুক্তি মাধ্যমের অপব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এটা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
সজীব ওয়াজেদ প্লেনারি সেশনে বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলোর সমস্যা তুলে ধরে বলেন, “আমরা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারলেও পুরোপুরি সমাধান করতে পারি না। আমরা অনেক সময় হ্যাকিং আটকাতে পেরেছি, কিন্তু হ্যাকারকে ধরতে পারি নাই।”
বাংলাদেশ ব্যাংকে হ্যাকিংয়ের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঘটনার সাথে অ্যামেরিকার সুইফট এবং ফিলিপাইন জড়িত ছিল। তবে বাংলাদেশ ছোট দেশ বলে কোনো সমাধান হয়নি। এই রকম ঘটনায় জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা দরকার।”
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়ে বালাকৃষ্ণান বলেন, এজন্য সবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
এস্তোনিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল তিসালু সাইবার আক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার তাগিদ দেন। আন্তর্জাতিক আইন ও সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক প্রতিনিধি ইজুমি নাকামিতসু এই প্রসঙ্গে বলেন, “দেড়শ দেশের স্বাস্থ্য সেবায় সাইবার অ্যাটাক হয়েছে। কারও একার পক্ষে এর প্রতিরোধ সম্ভব না। সবাইকে এজন্য এক সাথে কাজ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে জাপানের সাইবার নীতি বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওতাকাও বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “সাইবার জগতের কোনো ভৌত সীমা নেই। সকল রাষ্ট্রকে তথ্য-প্রযুক্তিতে নিরাপদ করার সামর্থ্য নেহায়েত অপ্রতুল।
“সন্ত্রাসী ও সহিংস উগ্রবাদীরা তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের বিষাক্ত বক্তব্য প্রচার করছে।”
তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত সাফল্যকে নিরাপদ রাখা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো নিয়মিতভাবে সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
শেখ হাসিনা অপরাধমূলক সাইবার কর্মকাণ্ডের উৎস শনাক্ত করতে পারার প্রযুক্তি ও তথ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবেশাধিকারের উপর জোর দেন।
তিনি বলেন, “অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সত্যিকার উৎস শনাক্তকরণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
শেখ হাসিনা বলেন, “ক্ষতিকর সাইবার কর্মকাণ্ড রোধ ও মোকাবেলায় জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অনাক্রমণাত্মক উপায় ব্যবহারকে উৎসাহিত করা উচিত। সাইবার বিশ্বে অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নটি যথাযথভাবে মোকাবেলা করা উচিত।”
সাইবার বিশ্বে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের নীতিমালা ও মূলনীতির নিঃশর্ত সমর্থন পাওয়া উচিৎ বলেও মত প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, সাইবার নিরাপত্তার সামর্থ্য বিনির্মাণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের এটিকে তাদের আন্তর্জাতিকভাবে নেওয়া অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা দিতে হবে।
বাংলাদেশ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা ইকো-সিস্টেম তৈরিতে কাজ করছে উল্লেখ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশে একটি সাইবার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়াধীন থাকার কথাও বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার চেষ্টা করছি।”
সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘের একটি উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্লেনারি সেশনে সজীব ওয়াজেদ ছাড়াও ইউএনওআইসিটির পরিচালক সালেম আভান, মাইক্রোসফটের সাইবার নিরাপত্তা কৌশল ও নীতি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক অ্যাঙ্গেলা ম্যাকে এবং আইসিটিফরপিসের এনেকেন টিক বক্তব্য রাখেন এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সমাপনী বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
এই অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের দেওয়া মধাহ্নভোজে যোগ দেন।

No comments